বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেওয়া দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের সব স্তরের উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বৈষম্যহীন ও সুন্দর ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১০ জুন) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের চতুর্থ দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলমের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সংকটের পর গঠিত তাঁর সরকারের প্রথম বাজেটটি মূলত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হচ্ছে।
১১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং ব্যবসায়ীদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের গৃহীত প্রধান পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন:
১. সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক নিবন্ধন: আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দফতর হতে এখন থেকে সব ধরনের আমদানি ও রফতানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
২. রফতানি ও আমদানি নীতি হালনাগাদ: বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে রফতানি নীতি ইতোমধ্যে হালনাগাদ করা হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজারে প্রবেশ সহজ করতে ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ হালনাগাদকরণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
৩. অশুল্ক বাধা দূরীকরণ: রফতানি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কাঁচামাল বা অন্যান্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত অশুল্ক বাধা (Non-tariff barriers) দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
৪. এফওসি (FOC) সুবিধার সম্প্রসারণ: বন্ডেড এবং নন-বন্ডেড সব ধরনের উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে ‘ফ্রি অব চার্জ’ বা ‘ফ্রি অব কস্ট’ (FOC)-ভিত্তিতে আমদানির সুযোগের আওতা আরও সম্প্রসারিত করছে সরকার।
৫. এলসি ছাড়াই আমদানির সুযোগ: আমদানি প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে মূল্য পরিশোধ পদ্ধতি সহজ করা হচ্ছে। এখন থেকে সব আমদানিকারকদের জন্য মূল্যসীমা নির্বিশেষে এলসি (Letter of Credit) ব্যতীত শুধুমাত্র চুক্তির (Contract) মাধ্যমে আমদানির বিশেষ সুযোগ রাখা হচ্ছে।
৬. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) চুক্তি বাস্তবায়ন ও ‘ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন’-এর মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও আধুনিক করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাণিজ্যিক সহজীকরণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
৭. কর্মসংস্থানমুখী বাজেট: ব্যবসায়ী তিনি ছোট ট্রেডার হোন কিংবা বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট—প্রত্যেকে যেন সুন্দরভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে দেশের তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন, আসন্ন বাজেটে সেই কর ও শুল্ক কাঠামো নির্ধারণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "স্বৈরাচারের পতনের পরে আমরা আরও পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছি যে কীভাবে দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।" তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে টেনে তুলতে হলে অর্থনৈতিক ‘ডিসিপ্লিন’ বা সুশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ক’দিন পরেই দেশের ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বাজেট উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই বাজেটে করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করা এবং দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখার সব আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্যারান্টি নিশ্চিত করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার।
মন্তব্য করুন